২০১৩ সালে মজার ইশকুলের কার্যক্রম শুরু হয় রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে। রাজধানী ঢাকার শাহবাগ পয়েন্টে ১৩ জন শিশুকে নিয়ে শুরু হয় এই যাত্রা। বর্তমানে ঢাকায় মজার ইশকুলের ৬টি ইশকুল রয়েছে, যার মধ্যে ২টি স্থায়ী ইশকুল (মজার ইশকুলঃ আগারগাঁও ও মজার ইশকুলঃ মানিকনগর) যেখানে বর্তমানে ৪০০ সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী জাতীয় শিক্ষা ক্রামানুসারে বিনামূল্যে শিক্ষা গ্রহণ করছে। খোলা আকাশের নিচে পরিচালিত ইশকুল ৪টি ইশকুলের (মজার ইশকুলঃ শাহবাগ, মজার ইশকুলঃ কমলাপুর, মজার ইশকুলঃ সদরঘাট এবং মজার ইশকুলঃ ধানমন্ডি) মাধ্যমে মাসে আমরা ১,০০০ সুবিধাবঞ্চিত শিশুর কাছে পৌঁছাতে পারছি।

উল্লেখ্য যে মজার ইশকুল এর কার্যক্রম ৪টি ধাপে বা ফেইজে বিভক্ত।

ফেইজ – ১: খোলা আকাশের নিচে পরিচালিত মজার ইশকুল

ফেইজ – ২: রাজধানী ঢাকার ভিতর স্থায়ী মজার ইশকুল

ফেইজ – ৩: রাজধানী ঢাকার বাহিরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মজার ইশকুল

এবং ফেইজ – ৪: অদম্য বাংলাদেশ চিল্ড্রেন ভিলেজ

 

মজার ইশকুলঃ আগারগাঁও

ফেইজ – ২ এর প্রথম স্থায়ী ইশকুল মজার ইশকুলঃ আগারগাঁও। মজার ইশকুল এর সূচনার প্রায় ৯ মাস পরের কথা। আগারগাঁও এর আইডিবি ভবনের পাশের খাবার এর দোকানের সামনে বিভিন্ন জনের কাছে খাবার চাইতে দেখা যেতো কিছু শিশুকে। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেলো তাদের ঠিকানা কাছেই, একটু সামনে হেঁটে গেলেই কুমিল্লা বস্তি।

তাদের নিয়েই মজার ইশকুলঃ আগারগাঁও। কুমিল্লা বস্তির ভেতরে শুধুমাত্র একটি রুমের মধ্যে ৩০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ০২ জানুয়ারি ২০১৪ সালে শুরু হয় মজার ইশকুলঃ আগারগাঁও এর যাত্রা। স্বেচ্ছাসেবীরাই পালা করে ক্লাস নিতো, ছিলো না কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষক। বৃষ্টিতে টিনের চাল বেয়ে অঝরে পানি পড়া, গরমে ঘেমে একাকার হওয়া এসব ছিলো খুবই সাধারণ ব্যপার। এরপর ধীরে ধীরে একটি রুম থেকে দুই রুমের ইশকুল, তারপর পাঁচটি রুমের মাধ্যমে চলতে থাকে স্বপ্ন পূরণের পথে হেঁটে চলা।

সেই মজার ইশকুল আগারগাঁও এখন আট কক্ষ বিশিষ্ট একটি ইশকুল, যেখানে সপ্তাহে ৫ দিন ১০০ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু পাচ্ছে মানসম্মত শিক্ষা। প্রতিটি ক্লাসের ১টি দেয়ালে রয়েছে শিশু ও ক্লাস উপযোগী আঁকা ছবি। আছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষনিক সিসিটিভি ক্যামেরা। আছে আট জন নিয়মিত শিক্ষক, যারা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে আরো একটু ভালো ভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে। শুধু শিক্ষাই না, তারা দিচ্ছে ভালোবাসা, যা এসকল শিশুদের জন্য সবচেয়ে জরুরী।

 

মজার ইশকুলঃ মানিকনগর

ফেইজ – ১ এর খোলা আকাশের নিচে পরিচালিত মজার ইশকুলঃ কমলাপুর ইশকুল । যেখানে ২০১৪ সালে ২য় ইশকুল হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে । উত্তরাঞ্চলের প্রবেশ মুখ হিসেবে পরিচিত কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ভাসমান শিশু প্রায় অর্ধশতাধিক । বছর ঘুরতেই এই সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছিলো নিয়মিত । যেহেতু স্টেশন পথশিশু মুক্ত থাকুক এটাই আমাদের লক্ষ্য তাই তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে আমরা দেখতে পাই ৬০ % – ৭০% পথশিশু আসে স্টেশন থেকে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার দূরত্বের মানিক নগর বালুর মাঠ থেকে । তাই আরও এক বছর তথ্য উপাত্ত নিয়ে খোলা আকাশের নিচের শিক্ষার্থী নিয়মিত ইশকুল মুখী করতে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সালে ৪ ক্লাসে ৬০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে মজার ইশকুলঃ মানিক নগর, যেখানে ২০১৯ সালে এসে মোট ৩০০ জন শিক্ষার্থী জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসারে পড়ালেখা করছে। শিক্ষকদের জন্য রয়েছে নিয়মিত ট্রেনিং এর ব্যবস্থা।

 

মজার ইশকুলঃ শাহবাগ

জানুয়ারি ১০, ২০১৩ সাল । প্রথম মজার ইশকুলের যাত্রা শুরু হয় এই ইশকুলের মাধ্যমে । মাত্র ১৩ জন পথশিশু নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয় মজার ইশকুলঃ শাহবাগের । খাদ্য – শিক্ষা – প্রযুক্তি এই শ্লোগানে পথচলা । অনাহারী পথের শিশুদের খাবার নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার গুরুত্ব বুঝবে এটাই আমাদের বিশ্বাস, শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হলে গতানুগতিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে আয়ের উৎস তৈরি করে দিতে পারলে পথশিশু সমস্যার উল্লেখযোগ্য সমাধান সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি । তাই শিক্ষার আগে খাদ্য নিশ্চিত করতে কাজ করছি শুরু থেকে ।

উদ্যানের খোলা আকাশের নিচে, রমনা কালি মন্দিরের কাছে বাংলা একাডেমির বিপরীতে কার্যক্রম শুরু হলেও অতিরিক্ত শীত এবং বর্ষার হাত থেকে রক্ষা পেতে ছবির হাটের নিকটে, টিএসসির বিপরীতে “ লালন চর্চা কেন্দ্র” নামক ছাউনির নিচে কার্যক্রম স্থানান্তরীত করা হয় , সেখানেই দীর্ঘ ৬ বছরের বেশি সময় ধরে কার্যক্রম চলছে।

 

মজার ইশকুলঃ কমলাপুর

কমলাপুর রেলস্টেশনকে উত্তরাঞ্চলের পথশিশুদের ঢাকায় প্রবেশের প্রবেশ মুখ বলা যায়, সহজলভ্য ট্রেন থাকার সুবিধায় এবং প্রচুর লোক সমাগম থাকায়, সহজেই খাবার এবং ছোট থেকে বড় , সব ধরণের অপরাধীদের আচরণ ভূমি হওয়ায় এখানে পথশিশুদের আধিক্য যে কোন স্থানের থেকে বেশী । তাই, মজার ইশকুলের পরিকল্পনা শুরুতেই যদি পথশিশুদের বুঝিয়ে গ্রামে পাঠানো যায় অথবা শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা যায় তবে রাজধানী ঢাকায় পথশিশুদের চাপ কমবে ।

তাই ২০১৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ৮ নং শহরতলী প্ল্যাটফর্ম এর বাহিরে খোলা জায়গায় মজার ইশকুল কমলাপুরের যাত্রা শুরু করে।

 

মজার ইশকুলঃ সদরঘাট

সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালকে ধরা হয় দক্ষিণাঞ্চলের পথশিশুদের প্রবেশ মুখ, লঞ্চের মত সহজলভ্য বাহনের কারণে খুব সহজেই সর্ব দক্ষিণের চরাঞ্চলের হাজার হাজার শিশু রাজধানীতে পা রাখে কিছু করে বেঁচে থাকতে, শিশু বয়সী, শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এই শিশুরা দ্রুত পথশিশু হিসেবে নিজেদের আবিষ্কার করে । মাদকের সহজলভ্যতায় বিভিন্ন অপরাধ্মূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে যায় এই সকল পথশিশুরা । এদের বয়স সাধারণত ৪ থেকে ১২/১৪ বছর হয়ে থাকে।

মূলত তাদের আপরাধ্মূলক কর্মকান্ডে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে পড়ার পূর্বে শিক্ষা ও যথাযথ যত্নের আওতায় আনার জন্য ২০ এপ্রিল ২০১৪ থেকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের ২য় তলার খোলা জায়গায় মজার ইশকুলঃ সদরঘাট এর কার্যক্রম শুরু হয়।

 

মজার ইশকুলঃ ধানমন্ডি

কামরাঙ্গীরচর ও রায়ের বাজার এর সকল পথশিশুর মিলন স্থান হলো ধানমণ্ডি রবীন্দ্র সরবর। এখানে দর্শনার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় শিশুরা খুব সহজেই তাদের কাছ থেকে খাবার চেয়ে খেতে পারে বা ভিক্ষা করতে পারে। এসকল শিশুরা কেউ কেউ ধানমন্ডি লেকের পানিতে লাফালাফি করছে, আবার কেউ কেউ ভিক্ষা করছে, কেউ আবার ফুল বিক্রি করছে ,কেউবা আবার কোন কিছু চুরি করতে চাচ্ছে। মূলত ধানমন্ডি লেকে এদের আনা-গোনাই খুব বেশি। তার শুধু পায় না ভালোবাসা ও পড়াশোনার সুযোগ।

তাই ২০১৮ সালের ০১ মে রবীন্দ্র সরোবর এ চালু হয় মজার ইশকুলঃ ধানমন্ডি।